সন্তান বাঁচল, ফিরলেন না বাবা: ছেলেকে বাঁচাতে বিলের অতলে হারিয়ে গেলেন ময়নুল

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
বাবার স্নেহের কাছে নিজের জীবনের মায়া কতখানি তুচ্ছ, তারই এক হৃদয়বিদারক নজির দেখল গাইবান্ধার সাঘাটাবাসী। চোখের সামনে বিলের অতল পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল প্রাণপ্রিয় দশ বছরের সন্তান। এক মুহূর্তও ভাবেননি বাবা; পরোয়া করেননি নিজের জীবনের। ছেলেকে বাঁচাতে গভীর পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। সন্তান বেঁচে ফিরেছে তীরে, কিন্তু যে বাবা বুক আগলে তাকে নতুন জীবন উপহার দিলেন, সেই বাবাই আর ফিরে এলেন না।
গতকাল বিকেলে উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নের তেলিয়ান বিলে ঘটে এই মর্মান্তিক ঘটনা। বিলের পানি থেকে নিখোঁজ বাবা ময়নুল ইসলামের (৩২) নিথর মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। নিহত ময়নুল বোনারপাড়া ইউনিয়নের সাতকালপানি গ্রামের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে এবং পেশায় পল্লী বিদ্যুতের ইলেকট্রিশিয়ান ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া তার ছেলের নাম মাহিদ (১০)।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বিকেল ৩টার দিকে ছুটির অবসরে ছেলে মাহিদকে সাথে নিয়ে ছোট একটি নৌকায় স্থানীয় তেলিয়ান বিলে মাছ ধরতে যান ময়নুল। বিলের মাঝপথে হঠাৎ অসাবধানতাবশত নৌকা থেকে গভীর পানিতে পড়ে যায় মাহিদ। চোখের সামনে সন্তানের এমন বিপদ দেখে কালবিলম্ব না করে নৌকা থেকেই বিলের পানিতে ঝাঁপ দেন ময়নুল। ছেলেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টার একপর্যায়ে তিনি নিজেই বিলের পানিতে তলিয়ে যান।
দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে স্থানীয়রা দ্রুত নৌকা নিয়ে এগিয়ে আসেন। তাদের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় শিশু মাহিদকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও পানির অতলে তলিয়ে যান হতভাগ্য পিতা। স্থানীয়রা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ময়নুলের সন্ধান না পেয়ে সাঘাটা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন।
খবর পেয়ে সাঘাটা ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তল্লাশি শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার টানা প্রচেষ্টার পর বিলের একটি গভীর খাদ থেকে ময়নুলের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে রংপুর থেকে একটি বিশেষ ডুবুরি দলকে ডাকা হয়েছিল। তবে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস মরদেহটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, ফলে ডুবুরি দলটি পথ থেকেই ফেরত যায়। পানিতে পড়ে যাওয়া মাহিদ বর্তমানে শঙ্কামুক্ত ও সুস্থ রয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নুল ইসলামের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে বাবার এমন আত্মত্যাগে পরিবার ও পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বেঁচে ফেরা ছোট্ট মাহিদ হয়তো সারাজীবন মনে রাখবে—তার এই বেঁচে থাকার পেছনে রয়েছে বাবার নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার এক নিঃস্বার্থ গল্প।





