ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল হচ্ছে, পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ বন্ধ

একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আগের মালিকদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার সুযোগ বন্ধ করতে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বিভিন্ন অংশীজনের মতামত ও সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ ধারা বিলোপ করা হবে।
সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎকারীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, বিভিন্ন মহলের মতামত বিবেচনায় নিয়ে ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় গুরুতর সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে গঠিত নতুন ব্যাংকটির ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেওয়া হবে আমানতকারীদের। এছাড়া আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ হিসেবে দিয়েছে আরও ৩৬ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমানে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ ঋণ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে বিভিন্ন সংস্থা। বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় শেষ মুহূর্তে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়। সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশটি হুবহু আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করলেও পরে নতুন এই ধারা সংযোজন করা হয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, এ ধারার মাধ্যমে আগের মালিকদের পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যা এস আলম গ্রুপের প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে।
আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছিল, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ারধারক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় উপযুক্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। একই ধারার উপধারায় উল্লেখ ছিল, আবেদন অনুমোদনের পর সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে, তার ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে পে-অর্ডার জমা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আইনটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গত ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিম উদ্দিন বিশ্বাসের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে ওই কমিটির সুপারিশ ছাড়াই ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়।
এ ধারা সংযোজনের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা আপত্তি জানায়। বাংলাদেশ ব্যাংকও ধারা বাতিলের পক্ষে মত দেয়। একই সঙ্গে ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন এবিবি ব্যাংক খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। একই সময়ে দেশের পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এছাড়া দেশের ২২টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা, যা মোট ঘাটতির অর্ধেকেরও বেশি।





