ওমানে হা/ম/লার মাঝেই উল্লাস করে সাগরে মাছ ধরছেন জেলেরা

ওমানে হামলার মাঝে ভয় না পেয়ে নিজেদেরকে চাঙা রাখতে উল্লাস করে সাগরে মাছ ধরছেন ওমানি জেলেরা। যখন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে রণবিমানের বিকট গর্জন আর মিসাইলের ঝলকানি এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, ঠিক তখনই ওমানি মৎস্যজীবীদের এই নির্ভীক ভিডিওটি পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছে।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, আরব সাগরের নীল জলরাশিতে ভাসমান একটি ছোট নৌকায় অবস্থান করছেন কয়েকজন ওমানি জেলে। তাদের মাথার ঠিক ওপর দিয়েই মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ইরানি লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে, আর দূর দিগন্তে শোনা যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রের বিকট শব্দ। এমন এক পরিস্থিতির মাঝেও ঐ মৎস্যজীবীরা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বরং প্রবল উল্লাসে মেতে উঠেছেন।
তাদের জালে ধরা পড়া বিশাল আকৃতির একটি মাছকে নৌকায় তোলার সময় তারা যেভাবে স্লোগান দিচ্ছিলেন এবং একে অপরকে উৎসাহিত করছিলেন, তা যুদ্ধের আতঙ্কের মুখে চরম মানসিক সাহসিকতার পরিচয় দেয়। জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারা সমুদ্রের মাঝপথ থেকে ফিরে না গিয়ে বরং নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পেশাকেই বেছে নিয়েছেন মনকে চাঙা রাখার উপায় হিসেবে। ভিডিওর এই অভাবনীয় দৃশ্যটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কামানের গোলা আর বারুদের গন্ধেও সাধারণ মানুষের সহজাত জীবনবোধ ও টিকে থাকার অদম্য আনন্দকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মূলত এটি ছিল যুদ্ধের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে এক প্রকার নীরব প্রতিবাদ।
এই ঘটনার সমান্তরালে মধ্যপ্রাচ্যের মূল রণক্ষেত্রে বর্তমানে চলছে এক প্রলয়ংকরী ধ্বংসলীলা। গত আটাশে ফেব্রুয়ারি শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসন শুরু করেছে। গত দশই মার্চ মঙ্গলবার ও পরদিন বুধবারের হামলাগুলোকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এবং তেহরানের সাধারণ বাসিন্দারা এই যুদ্ধের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত হওয়া সবচেয়ে ভয়ংকর ও তীব্র হামলা বলে বর্ণনা করেছেন।
পেন্টাগনের এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন যে, বর্তমান সময়ের এই অভিযানগুলোতে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক চৌকস যোদ্ধা, উন্নত যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের ভেতরকার অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে এই মুহুর্মুহু আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এমনকি দিনশেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যালে' দাবি করেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী গত কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের দশটি মাইন স্থাপনকারী ও নিষ্ক্রিয় জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।
জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর- আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা ওমান, কাতার, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে কাতারের আল-উদেইদ এবং ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের আল-হারির ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া বুধবার ভোরে বাহরাইনের জুফায়ের নৌঘাঁটি এবং আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়ে মার্কিন সেনাদের ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে ইরান।
শুধু তাই নয়, ইরান থেকে সরাসরি ইসরায়েলের কেন্দ্রস্থল লক্ষ্য করে বেশকিছু শক্তিশালী রকেট ছোড়া হয়েছে, যা প্রতিহত করার সময় ইসরায়েলি আকাশসীমায় বিকট শব্দ শোনা যায় এবং সাধারণ মানুষ প্রাণের ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে থাকে।
এদিকে, হোয়াইট হাউস থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে যে, বিশ্বের তেল ও গ্যাসের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার জবাবে ইরানে আরও শক্তিশালী হামলা চালানো হবে। যুদ্ধের কারণে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহন এখন কার্যত থমকে যাওয়ার উপক্রম।
ধ্বংস আর প্রাণহানির এই করুণ মিছিলের মাঝেও ওমানি জেলেদের সেই মাছ ধরার দৃশ্যটি যেন সাহসিকতা আর মানবিকতার এক পরম বার্তা হয়ে টিকে আছে। ওমানি নাগরিকদের এই উদ্যম বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, শত বিপদের মাঝেও নিজেদের মনোবল ধরে রাখাটাই হলো প্রকৃত বিজয়।





