কোরবানির ১৫ দিন পরও বিক্রি হয়নি লবণযুক্ত চামড়া; দুশ্চিন্তায় চট্টগ্রামের আড়তদাররা

জোবায়ের হোসেন, চট্টগ্রাম :
চট্টগ্রামে কোরবানির ঈদের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও লবণযুক্ত চামড়ার বাজারে দেখা মিলছে না প্রত্যাশিত ক্রেতার। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের অনাগ্রহ এবং সরকারি দরের তুলনায় অনেক কম দামে চামড়া কেনার প্রস্তাবে চরম সংকটে পড়েছেন আড়তদাররা।
আড়তদারদের অভিযোগ, ঢাকা থেকে হাতে গোনা কয়েকজন ট্যানারি মালিক এলেও তারা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম হাঁকাচ্ছেন মাত্র ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা। এর সঙ্গে আরও ২৫ শতাংশ বিভিন্ন খাতে কর্তনের কারণে কার্যত সরকারি দরের এক-তৃতীয়াংশও পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
সরকার চলতি মৌসুমে ঢাকার বাইরের গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছিল প্রতি বর্গফুট ৫৬ থেকে ৬২ টাকা।
'চট্টগ্রামে সংগ্রহ হয়েছে ৪ লাখের বেশি চামড়া'
এবার চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর মোট ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০টি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে—
গরুর চামড়া: ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০টি
ছাগলের চামড়া: ৫৩ হাজার ৮০০টি
বাকিগুলো মহিষের চামড়া
তবে পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় এসব চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে গুদাম ও অস্থায়ী ডিপোতে রাখা হয়েছে।
'আতুরার ডিপোতে বাড়ছে উদ্বেগ'
চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো ঘুরে দেখা গেছে, গুদামের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ত্রিপল টাঙিয়ে লবণযুক্ত চামড়া সংরক্ষণ করছেন ব্যবসায়ীরা। বর্ষার বৃষ্টিতে এসব চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
আড়তদারদের ভাষ্য, লবণযুক্ত চামড়া সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব। এরপর ধীরে ধীরে চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হতে থাকে।
'২০১৯ থেকে টানা সংকটে চামড়া খাত'
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০১৯ সাল থেকে এ খাতে নৈরাজ্য শুরু হয়। করোনা মহামারির সময় চট্টগ্রামে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া বিক্রি না হওয়ায় সেগুলো রাস্তায় ফেলে দিতে বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা।সেই সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রাস্তা থেকে দেড় লাখের বেশি চামড়া সংগ্রহ করে ডাম্পিং করেছিল। ২০২০ সালেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ধস নামে চামড়া ব্যবসায়।
‘সরকারি দরের এক-তৃতীয়াংশও মিলছে না’
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, “ঢাকার ট্যানারি মালিক বা বড় ক্রেতারা আসছেন না। কয়েকজন ক্রেতা এলেও তারা ৩৫-৩৭ টাকা দর দিচ্ছেন। পরে সেখান থেকেও ২৫ শতাংশ কেটে নেওয়া হয়। অথচ সরকার নির্ধারিত দর ৫৬-৬২ টাকা।”তিনি বলেন, “কোরবানির আগে সরকার চামড়া সংরক্ষণে জোর দেয়। কিন্তু কোরবানির পর বাজার মনিটরিং না থাকায় প্রতিবছর ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হয়।”
তার দাবি, ট্যানারি মালিকরা সরকার থেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেলেও আড়তদাররা কোনো প্রণোদনা বা সহায়তা পান না। একসময় চট্টগ্রামে প্রায় ১৫০ জন আড়তদার থাকলেও লোকসানের কারণে এখন সেই সংখ্যা কমে ২৫ থেকে ৩০ জনে নেমে এসেছে।
'ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে ২০-২২ কোটি টাকা'
আড়তদার সমিতির সহ-সভাপতি সম্রাট মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে চট্টগ্রামের আড়তদারদের প্রায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
তিনি বলেন, “মূলধন হারিয়ে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেছেন। এবারও লবণযুক্ত চামড়া বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে আগ্রহ হারাবেন।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের জাতীয় সম্পদ চামড়া খাত তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।”
'তৃতীয় পক্ষ হয়ে পড়ছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা'
আতুরার ডিপোর বাইরে বিভিন্ন উপজেলাতেও অনেক ব্যবসায়ী কাঁচা চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে ক্রেতা না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকেই চামড়া ঢাকার আড়তদারদের কাছে পাঠাচ্ছেন।
এতে ট্রাক ভাড়া, আড়তদারি খরচসহ অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি ঢাকার আড়তদারদের সঙ্গে ট্যানারি মালিকদের সরাসরি চুক্তি থাকায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা তৃতীয় পক্ষ হয়ে পড়ছেন। ফলে পাওনা টাকা আদায়েও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা।
'বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার চামড়া'
আড়তদার সমিতির নেতারা জানান, এখন পর্যন্ত দুটি মাদ্রাসার প্রায় ৩৫ হাজার চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। অথচ সাধারণত কোরবানির ঈদের এক সপ্তাহ পর থেকেই লবণযুক্ত চামড়ার জমজমাট বেচাকেনা শুরু হয়।এবার সেই বাজারে ভাটা পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
'দর না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মৌসুমি ব্যবসায়ীরা'
প্রতি বছর পাড়া-মহল্লা ও গ্রামাঞ্চল থেকে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করেন হাজারো মৌসুমি ব্যবসায়ী। এবার তারা আকারভেদে প্রতি চামড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় সংগ্রহ করেছেন।
কিন্তু অনেকেই প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে চামড়া এতিমখানা, মসজিদ ও মাদ্রাসায় দান করে দিয়েছেন। কেউ কেউ বিক্রির আশায় আতুরার ডিপোতে নিয়ে এলেও ক্রেতা না পেয়ে রাস্তায় ফেলে খালি হাতে ফিরে গেছেন।
'বিশ্ববাজারেও চ্যালেঞ্জ'
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দূষণমুক্ত উৎপাদন ব্যবস্থা ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা কমপ্লায়েন্স অর্জনে পিছিয়ে থাকায় বিশ্ববাজারে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প।
যদিও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে বিবেচিত হয়, তবুও দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।





