আরবের মরুভূমিতে বালুর মাঝে মিলছে অদ্ভূত ‘মাছ’!

আরবের মরুভূমিতে বালুর মাঝে পাওয়া যাচ্ছে অদ্ভূত মাছ। আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। উত্তপ্ত মরুভূমির দিগন্তজোড়া বালুরাশির নিচে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব থাকা নতুন কিছু নয়, কিন্তু মাছের মতো সাঁতার কাটা কোনো প্রাণীর সন্ধান মেলায় প্রকৃতিপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহলের অন্ত নেই।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, ধুধু মরুভূমির তপ্ত বালুর নিচ থেকে এক ব্যক্তি অদ্ভুত এক প্রাণীকে টেনে বের করছেন, যা দেখতে অনেকটা মাছের মতো হলেও এর চলাফেরা এবং স্বভাব একেবারেই ভিন্ন। প্রাণীটির শরীর মসৃণ এবং আঁশযুক্ত, যা রোদে চকচক করছিলো। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, বালুর ওপর ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথেই প্রাণীটি পানির মতো দ্রুততার সাথে বালুর গভীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ঐ পোস্টে প্রাণীটিকে ‘মরুভূমির মাছ’ বা ‘ডেজার্ট ফিশ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ এটি শেয়ার করেন।
বিজ্ঞানীদের মতে, এটি আসলে কোনো মাছ নয়, বরং এক বিশেষ প্রজাতির সরীসৃপ বা টিকটিকি। ইংরেজিতে একে ‘স্যান্ডফিশ স্কিঙ্ক’ বলা হয়। যদিও এর নাম ‘মাছ’ রাখা হয়েছে, কিন্তু জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গোত্রের প্রাণী। তবে বালুর নিচে এর চলাচলের ধরণ এতটাই নিখুঁত এবং ছন্দময় যে, দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো মাছ শান্ত জলাশয়ে সাঁতার কাটছে। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই আরবের স্থানীয় বাসিন্দারা একে মরুভূমির মাছ বলে ডেকে থাকেন।
এই অদ্ভুত প্রাণীটির প্রধান আবাসস্থল হলো মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার বিশাল মরুভূমি অঞ্চল। বিশেষ করে সাহারা মরুভূমি এবং আরব উপদ্বীপের উত্তপ্ত বালুরাশিতে এদেরকে বেশি দেখা যায়। এদের শারীরিক গঠন এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যে, এরা বালুর বিশাল চাপের মধ্যেও খুব সহজে যাতায়াত করতে পারে। পাগুলো আকারে ছোট হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী, যা এদের বালুর নিচে দ্রুত গতিতে এগোতে সাহায্য করে। এছাড়া নাকের ছিদ্র এবং চোখ এমনভাবে সুরক্ষিত থাকে, যাতে বালুর কণা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
ভিডিওটিতে দেখা প্রাণীটির গায়ের রঙ বালুর সাথে এমনভাবে মিশে থাকে যে, একে খালি চোখে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। এটি এদের আত্মরক্ষার একটি প্রধান কৌশল। শিকারী প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে এরা চোখের পলকে বালুর গভীরে চলে যেতে পারে। প্রায় চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি লম্বা এই সরীসৃপটি মরুভূমির প্রখর তাপমাত্রাতেও দীর্ঘক্ষণ টিকে থাকতে সক্ষম। এদের শরীরের আঁশগুলো এতটাই মসৃণ যে, বালুর সাথে ঘর্ষণ এদের গতিরোধ করতে পারে না।
মরুভূমির এই রহস্যময় প্রাণীটি প্রধানত ছোট ছোট পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। বালুর নিচে থেকেও এরা বালুর ওপরের কম্পন অনুভব করতে পারে এবং নিখুঁতভাবে শিকার ধরে ফেলে। প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের কাছে স্যান্ডফিশ স্কিঙ্ক বরাবরই গবেষণার বিষয়। বিশেষ করে ঘর্ষণহীন চলাচলের জন্য এদের গায়ের চামড়ার গঠন প্রকৌশলীদের অবাক করে দেয়। আধুনিক প্রযুক্তিতে এই গঠনশৈলী ব্যবহার করার কথা ভাবছেন অনেক গবেষক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি প্রকাশের পর থেকে নেটিজেনদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ একে প্রকৃতির অলৌকিক সৃষ্টি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মরুভূমির বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘বালুর মাছ’ হিসেবেই বেশি পরিচিতি পেয়েছে।
আরবের মরুভূমিতে পাওয়া এই অদ্ভুত প্রাণীটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের আরও অনেক কিছু বাকি। আপাতদৃষ্টিতে যা কেবল বালুর সমুদ্র মনে হয়, তার গভীরেও লুকিয়ে আছে এমন সব বিচিত্র জীবন, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। মরুভূমির এই মাছ তথা ‘স্যান্ডফিশ স্কিঙ্ক’ আমাদের শেখায়, প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার জন্য প্রকৃতির নিজস্ব এক অদ্ভুত পরিকল্পনা থাকে।





