আপাতত হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব না: মার্কিন নৌবাহিনী

বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে যাতায়াত করা কোনো জাহাজকে সামরিক নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা এই ঘোষণাটি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। মার্কিন নৌবাহিনী স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে বারবার অনুরোধ আসা সত্ত্বেও তারা এই মুহূর্তে সেগুলোকে পাহারা দিয়ে পার করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে না।
মার্কিন নৌবাহিনীর এই পিছুটান দেশটির প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের অবস্থানের সঙ্গে বড় ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করেছে। যেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন প্রয়োজন হলে মার্কিন বাহিনী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পার করাবে, সেখানে খোদ নৌবাহিনীর এই অপারগতা প্রকাশ আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, সময় এলে তার দেশ ও মিত্ররা মিলে রণতরি পাঠিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ এখন প্রকাশ্য সংঘাতের রূপ নিয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল এলাকা এখন আক্ষরিক অর্থেই এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু পথ দিয়ে যায়। কিন্তু উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকায় এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে, যেখানে তেলের দাম দুই হাজার বাইশ সালের পর এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের পক্ষ থেকে এক কঠোর হুঁশিয়ারিতে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালি এখন তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং কোনো জাহাজ সেখান দিয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখালে সরাসরি গোলা ছোঁড়া হবে। ইতোমধ্যে বেশকিছু জাহাজ হামলার শিকার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এই হুমকির মুখে মার্কিন নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে জাহাজ মালিক ও তেল শিল্পের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করলেও সেখানে তারা কোনো আশার আলো দেখাতে পারছে না। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, নৌবাহিনী সরাসরি বলেছে, হামলার ঝুঁকি বর্তমান পর্যায়ে এতটাই বেশি যে, এসকর্ট বা সামরিক নিরাপত্তা দিয়েও জাহাজগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
গত নয় ও দশ মার্চের ঘটনাবলি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। একদিকে যখন মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বিকল্প উপায়ের সন্ধানে কাজ করার কথা বলছেন, অন্যদিকে নৌবাহিনী কোনো জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এমনকি মার্কিন জ্বালানি সচিবের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ঘিরেও রহস্য তৈরি হয়েছে। তিনি একটি জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি করে পরে সেই পোস্টটি মুছে ফেলেন। বাস্তবে রয়টার্সের মতো বার্তা সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এখন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা দিয়ে পার করেনি।
এই অচলাবস্থার ফলে কয়েকশো তেলবাহী জাহাজ এখন সাগরে নোঙর করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষা করছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে। সমুদ্র নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিকে নিরাপদ করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। কারণ ইরান এখানে সাশ্রয়ী কিন্তু বিধ্বংসী ড্রোন এবং সমুদ্রের নিচে মাইন পেতে রাখার কৌশল নিয়েছে। এই বিশাল উপকূলীয় এলাকায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো বাহিনীর পক্ষেই শতভাগ নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।
হরমুজ প্রণালি এখন এক প্রয়াণফাঁদে পরিণত হয়েছে। একদিকে পেন্টাগন ইরানের মাইন সংরক্ষণাগারে হামলার মাধ্যমে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ জাহাজগুলো গভীর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। যদি খুব দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তবে কেবল তেলের দাম নয়, বরং বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাই এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিপতিত হতে পারে। আপাতত মার্কিন নৌবাহিনীর এই 'না' বলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটিকে বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার কফিনে একটি বড় পেরেক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।






