ভিক্ষুকের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পাওয়া গেল লাখ লাখ টাকা: নেপথ্যে ভয়ানক প্র’তা’র’ণা!

ভিক্ষুকের মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে পাওয়া গেল লাখ লাখ টাকা। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর এলাকায় এমন এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হয়েছে, যা শুনে খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারাও হতবাক; যেখানে সাধারণ ভিক্ষুকদের নামে খোলা মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট ব্যবহার করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার এক মায়ের কাছে আসা একটি রহস্যময় ফোন কলকে কেন্দ্র করে। ঐ নারীর মেয়ে সুইডেন প্রবাসী। চক্রটি ঐ প্রবাসীর কণ্ঠ নকল করে তার মাকে ফোন দেয়। ফোনে জানানো হয়, মেয়েটি কাউকে না জানিয়ে দেশে ফিরেছে এবং বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় একটি হাসপাতালে ভর্তি। উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে বড় অংকের টাকার প্রয়োজন।
মেয়ের বিপদের কথা শুনে বিচলিত মা বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা 'রকেট'-এর মাধ্যমে কয়েক দফায় প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা পাঠিয়ে দেন। টাকা পাঠানোর কিছুক্ষণ পর থেকেই ঐ নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সুইডেনে মেয়ের সাথে যোগাযোগ করলে ঐ নারী বুঝতে পারেন যে তিনি এক বিশাল কপটতার শিকার হয়েছেন।
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি। সিআইডি মালিব্যাগ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখা এই রহস্য উন্মোচনে কাজ শুরু করে। যে নম্বরটিতে টাকা পাঠানো হয়েছিলো, সেটির অবস্থান ও পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করে তারা। তদন্তে বেরিয়ে আসে এক বিস্ময়কর তথ্য। দেখা যায়, ঐ নম্বরটি আসলে স্থানীয় এক ভিক্ষুকের নামে নিবন্ধিত। অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো এক ব্যক্তি অনুদান দেওয়ার নাম করে ঐ ভিক্ষুকের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সিমটি সংগ্রহ করেছিলো।
তদন্তের জাল বিস্তৃত করে সিআইডি কয়েকশো নম্বর ট্র্যাক করার পর শেষ পর্যন্ত এই চক্রের মূল হোতাদের হদিস পায়। এরপর এক বিশেষ অভিযানে এক মধ্যবয়সী দম্পতিকে আটক করা হয়। আটককৃতরা হলেন মোবারক হোসেন ও সুলতানা খাতুন। তাদের বাড়িতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে বেরিয়ে আসে আরও চমকপ্রদ তথ্য। দম্পতির শোবার ঘরের একটি ট্রাঙ্ক থেকে উদ্ধার করা হয় নগদ একুশ লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা। এছাড়া তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রায় অর্ধশতাধিক সিম কার্ড, যা বিভিন্ন অসহায় মানুষের নামে নিবন্ধিত।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, এই দম্পতি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের এই অপরাধের জাল বিস্তার করেছিলো। তারা মূলত সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের লক্ষ্যবস্তু বানাতো। সরকারি রেশন, ভাতা কিংবা বিভিন্ন আর্থিক সাহায্য পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তারা ভিক্ষুক ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সিম কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্য সংগ্রহ করতো। এরপর সেই সিম ব্যবহার করে তারা প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করতো। কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে কিংবা ইমোশনাল পরিস্থিতি তৈরী করে তারা দাবি করতো প্রবাসীরা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্বজনদের এই চরম সংকটের মুহূর্তে তারা টাকার দাবি করতো এবং মানুষও সরল বিশ্বাসে তাদেরকে টাকা পাঠিয়ে দিত।
সিআইডির তথ্যমতে, এই দম্পতি গত চার বছর ধরে এই অপরাধের সাথে যুক্ত। তাদের উদ্ধারকৃত আটটি সিম কার্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাত্র ছয় মাসে ঐ নম্বরগুলো দিয়ে প্রায় দশ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চার বছরে তারা কোটি টাকারও বেশি অর্থ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। এই বিশাল অংকের টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছু মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টেরও যোগসাজশ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিআইডি ইতোমধ্যে ঐসব এজেন্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মোবারক ও সুলতানা পেশাদার অপরাধী। তারা অত্যন্ত সুচতুরভাবে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করেছে। বর্তমানে এই দম্পতি পুলিশি হেফাজতে রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান।






