২০৪২ সালেও তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী থাকবেন' বক্তব্য, জয়নুল আবদিনকে সতর্ক করল বিএনপি

‘দুই হাজার বেয়াল্লিশ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকবেন তারেক রহমান’- এমন বক্তব্যের পর বিএনপি নেতা ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুককে সতর্ক করেছে বিএনপি। এগারোই মার্চ বুধবার দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের একজন সিনিয়র নেতার এমন সুদূরপ্রসারী ও বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে খোদ বিএনপির ভেতরেই অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, যার ফলে অতি দ্রুততার সাথে তাকে কারণ দর্শানো বা সতর্কতামূলক বার্তা প্রদান করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার। রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা জয়নুল আবদিন ফারুক। সেখানে সমসাময়িক রাজনীতি ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি মেতে ওঠেন এক অদ্ভুত ভবিষ্যৎবাণীতে। সেখানে তিনি অত্যন্ত প্রত্যয়ের সাথে দাবি করেন যে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান কেবল দুই হাজার ছাব্বিশ কিংবা দুই হাজার বত্রিশ সাল পর্যন্তই নয়, বরং দুই হাজার সাইত্রিশ সাল ছাড়িয়ে দুই হাজার বিয়াল্লিশ সাল পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে আসীন থাকবেন।
নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে উদাহরণ টেনে এই প্রবীণ রাজনীতিক সেখানে উল্লেখ করেন, তিনি ছয়বার জাতীয় সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন এবং সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি বুঝতে পারছেন তারেক রহমানের নেতৃত্বেই দেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। প্রভাত দেখলেই যেমন দিনের বাকিটা সময় কেমন যাবে তা আঁচ করা যায়, তেমনি তারেক রহমানের বর্তমান রাজনৈতিক দক্ষতা দেখে ফারুকের মনে হয়েছে যে, এই মানুষটিই দেশের হাল ধরার জন্য উপযুক্ত এবং তিনি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থাকবেন।
জয়নুল আবদিন ফারুকের এই বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই তা ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ নেটিজেনদের মাঝেও শুরু হয় তীব্র সমালোচনা।
এই ঘটনার রেশ ধরে বিএনপির হাইকমান্ড বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে আগাম মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার বার্তা দিতেই ফারুকের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বুধবার দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে জয়নুল আবদিন ফারুককে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দলের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী বা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক নেতার দায়িত্ব।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জয়নুল আবদিন ফারুকের এই বক্তব্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিব্রত করেছে। বিশেষ করে একজন উপদেষ্টার মুখে বছরের পর বছর ক্ষমতায় থাকার এই দম্ভোক্তি সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা পাঠাতে পারে। দলের নীতি নির্ধারকরা মনে করছেন, এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সুযোগ করে দেয় এবং জনমনে বিএনপির গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠার পরপরই বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপগুলোতেও এই নিয়ে বেশ কানাঘুষা শুরু হয়। মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী ফারুকের এই বক্তব্যকে ‘অতি-উৎসাহী’ কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছেন।
জয়নুল আবদিন ফারুকের মতো একজন অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য ও পোড়খাওয়া রাজনীতিক কেন এমন মন্তব্য করলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা বিশ্লেষণ চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, দলের শীর্ষ নেতার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তিনি এমন আবেগী বক্তব্য দিয়েছেন। তবে ফল হয়েছে উল্টো। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত তাকে সতর্কবার্তা শুনতে হলো।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, দলের এই সতর্কবার্তার পর জয়নুল আবদিন ফারুকের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এই কঠোর বার্তার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দলের নীতি ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।






