সৌদি যুবরাজের উপহারের খেজুরে ‘ভূত’: কুমিল্লায় পৌঁছাতেই ২০ কার্টন গায়েব!

সৌদি যুবরাজের উপহার হিসেবে পাওয়া খেজুর ঢাকা থেকে কুমিল্লায় পৌঁছাতেই বিশটি কার্টন উধাও হয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর এক তথ্য সামনে এসেছে। মক্কা-মদিনার পুণ্যভূমি থেকে পাঠানো এই মানবিক সহায়তার একাংশ মাঝপথেই গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনায় জেলাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সমালোচনা ও ধোঁয়াশা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সৌদি আরবের যুবরাজ এবং কিং সালমান হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে মোট বারো হাজার পাঁচশো কার্টন উন্নত মানের খেজুর উপহার হিসেবে পাঠানো হয়। গত পহেলা মার্চ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে এই খেজুরগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই তালিকা অনুযায়ী, কুমিল্লা জেলার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিলো মোট পাঁচশো বিশ কার্টন খেজুর। অধিদপ্তরের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে এখনো এই বরাদ্দের তথ্যটি স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে ঘটনার মোড় ঘোরে গত আটই মার্চ, যখন কুমিল্লা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জেলার সতেরোটি উপজেলায় এই খেজুর বণ্টন করা হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সতেরোটি উপজেলায় মোট পাঁচশো কার্টন খেজুর বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসেবে যে পাঁচশো বিশ কার্টন খেজুর কুমিল্লায় আসার কথা ছিল, তার মধ্যে বিশটি কার্টনের কোনো হদিস নেই। এই বিপুল পরিমাণ উপহারের খেজুর কোথায় গেল বা কার পকেটে গেল, তা নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
এই রহস্যজনক নিখোঁজ সংবাদটি সামনে আসার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে একটি সাধারণ ভুল হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবেদ আলী এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, তাদের কাছে মন্ত্রণালয় থেকে পাঁচশো বিশ কার্টন নয়, বরং পাঁচশো কার্টন খেজুরই পৌঁছেছে। তার দাবি অনুযায়ী, তারা যা হাতে পেয়েছেন, ঠিক সেটিই উপজেলাগুলোতে বিতরণ করেছেন। অধিদপ্তরের তালিকায় পাঁচশো বিশ কার্টনের কথা উল্লেখ থাকলেও তিনি দাবি করেন, পরবর্তীতে এই বরাদ্দ সংশোধন করে পাঁচশো করা হয়েছে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইটে কুমিল্লার জন্য বরাদ্দের পরিমাণ এখনো পাঁচশো বিশ কার্টন হিসেবেই প্রদর্শিত হচ্ছে। যদি সংশোধন করা হয়েই থাকে, তবে সরকারি পোর্টালে কেন তার প্রতিফলন নেই- এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি।
এই ঘটনার পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের হাত রয়েছে কিনা, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। গত দশই মার্চ রাতে কুমিল্লা-চার দেবিদ্বার আসনের সংসদ সদস্য Hasnat আবদুল্লা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে তার নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের হিসেব দিচ্ছিলেন। সেই আলোচনা চলাকালীন তিনি জানান, তার এলাকায় মোট ঊনচল্লিশ কার্টন খেজুর বরাদ্দ পাওয়া গেছে। সংসদ সদস্যের এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই খেজুরের সংখ্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও তোলপাড় শুরু হয়।
মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন যে, যদি জেলা পর্যায়ে বরাদ্দের হিসেবেই বিশ কার্টনের গরমিল থাকে, তবে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরও কত উপহার গায়েব হয়ে গেছে? যেখানে সৌদি আরবের মতো একটি বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র থেকে রাজকীয় উপহার হিসেবে সাধারণ মানুষের জন্য এই খাদ্য সহায়তা পাঠানো হয়েছে, সেখানে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে বিশটি কার্টন উধাও হয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা হতে পারে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাবের একটি প্রতিচ্ছবি। সরকারি তালিকায় এক তথ্য আর মাঠ পর্যায়ে বিতরণে অন্য তথ্য- এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় কোথাও বড় ধরনের ত্রুটি বা অনিয়ম রয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য আসা এই উপহারের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব বের করা এবং এর সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর পাঠানো এ ধরনের মানবিক সহায়তা ভবিষ্যতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।





