সোডা ও ডিটারজেন্ট দিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘পূর্ণ ননিযুক্ত খাটি দুধ’, দুধের নামে কি খাচ্ছেন!

সোডা ও ডিটারজেন্ট দিয়ে তৈরি হচ্ছে কথিত ‘পূর্ণ ননিযুক্ত খাটি দুধ’। দেখতে ধবধবে সাদা আর ঘন হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল আর নকল দুধের পার্থক্য বোঝা প্রায় অসম্ভব। তবে নেপথ্যের গল্পটি অত্যন্ত আতঙ্কজনক। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সোডা, ডিটারজেন্ট পাউডার, ডালডা, ইউরিয়া এবং হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে এই তথাকথিত খাটি দুধ।
গত নয়ই মার্চ পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার 'কেয়া ডেইরি'তে এক ঝটিকা অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় পরিচালিত এই অভিযানে বেরিয়ে আসে নকল দুধ তৈরির রোমহর্ষক সব তথ্য। সেখানে থাকা ল্যাবরেটরিতে তাৎক্ষণিক পরীক্ষার পর দেখা যায়, সংগৃহীত দুধে প্রচুর পরিমাণে ডিটারজেন্ট এবং হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের উপস্থিতি রয়েছে। অথচ এই হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মূলত টেক্সটাইল বা পোশাক শিল্পে কাপড়ের রঙ উজ্জ্বল করতে ব্যবহৃত হয়, যা কোনোভাবেই মানুষের খাবারের সঙ্গে মেশানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। এই ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো দুধের স্থায়িত্ব বাড়াতে এবং ঘনত্ব বৃদ্ধি করতে ব্যবহার করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।
অভিযানের সময় কেয়া ডেইরির মালিক আয়শা সিদ্দিকা কেয়াকে তিন লক্ষ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে জব্দ করা হাজার হাজার লিটার ভেজাল দুধ ড্রেনে ঢেলে নষ্ট করে দেওয়া হয়। শুধু কেয়া ডেইরি নয়, পাশের আমিনা ডেইরিকে ত্রিশ হাজার টাকা এবং প্রিমিয়াম ফুডসকে বিশ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে দুধ সংরক্ষণ এবং অস্বাস্থ্যকর ও নিষিদ্ধ কেমিক্যাল ব্যবহারের দায়ে তাদের এই কঠোর শাস্তি প্রদান করেন ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ইমামা বানিন। কীভাবে মানুষের জীবনের তোয়াক্কা না করে এমন বিষাক্ত কাজ দিনের পর দিন চলে আসছিলো, তা নিয়ে অভিযানের সময় সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তারা বিস্ময় প্রকাশ করেন।
এই ভেজাল দুধের সিন্ডিকেটটি মূলত পাবনার ঐতিহ্যবাহী ডেইরি শিল্পের আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে ভেজাল মিশ্রিত এই সাদা বিষ ট্রাকভর্তি করে চলে যাচ্ছে সিলেট, চট্টগ্রাম এবং রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এই বিষাক্ত মিশ্রণ দিয়ে শুধু তরল দুধই বাজারজাত করা হচ্ছে না, বরং তা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ঘি, মিষ্টি এবং ছানাজাতীয় নানা মুখরোচক খাদ্যপণ্য। সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে চড়া দাম দিয়ে 'দেশি পণ্য' মনে করে এই বিষাক্ত তরল কিনে নিচ্ছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এই ভেজাল দুধের নিয়মিত সেবনে মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে ঘাতকব্যাধি ক্যান্সার, কিডনি চিরতরে অকেজো হওয়া এবং লিভারের মারাত্মক জটিল সব রোগ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও মেধার বিকাশে দুধ অপরিহার্য হলেও এই বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত দুধ তাদের স্নায়ুতন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। ইউরিয়া আর ডিটারজেন্ট মানুষের অন্ত্রের আবরণ নষ্ট করে দেয়, যা থেকে পরে আলসার বা ক্যান্সারের মতো রোগ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘকাল ধরে এই রাসায়নিকগুলো রঞ্জকে মিশলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসনের এই অভিযান প্রশংসনীয় হলেও বর্তমানে যে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে তা অপরাধের তুলনায় সামান্য। জরিমানা দিয়ে এই অসাধু ব্যবসায়ীরা খুব সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। অথচ এই সাদা বিষের মাধ্যমে তারা মানুষের যে অপূরণীয় ক্ষতি করছে, তার মূল্য কোনো অর্থ দিয়েই শোধ করা সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে দেশজুড়ে নিয়মিত তদারকি ও নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানোর। শুধুমাত্র বিশেষ দিবসে বা মাঝেমধ্যে অভিযানের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় পর্যায়ে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে, এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি এই ভেজাল সিন্ডিকেট দমনে সাধারণ মানুষের সচেতনতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।





