লালমনিরহাটে মাটির হাঁড়িতে সোনার মোহরের স্বপ্ন: সব হারিয়ে পথে বসা পরিবারগুলো

লালমনিরহাটে মাটির হাড়িতে সোনার মোহরের লোভে পড়ে সব হারিয়ে আজ পথে বসেছে বেশ কয়েকটি পরিবার। অলৌকিক গুপ্তধন আর জিনের দেওয়া সম্পদের প্রলোভনে পড়ে ভিটেমাটি হারিয়ে এখন দিশেহারা এই মানুষগুলো। কথিত জিনের বাদশার ফাঁদে পড়ে সদর উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের ফকিরটারী গ্রামের বেশকিছু স্বচ্ছল পরিবার আজ চরম অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় জনৈক কবিরাজের হাত ধরে। তার দাবি ছিল, তার দেওয়া বিশেষ মাটির হাঁড়িতে লুকানো আছে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণমুদ্রা। শুধু তাই নয়, সেখানে নাকি এমন প্রাচীন হীরা রয়েছে, যা সাত রাজার ভাগ্য বদলে দিতে পারে। সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছিলো যে, এসব সম্পদ জিনের দেওয়া গুপ্তধন। লাল কাপড়ে মোড়ানো সেই রহস্যময় হাঁড়ির লোভে পড়ে একের পর এক পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু তুলে দেয় চক্রটির হাতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বেশ কয়েকটি ধাপে তাদের কার্যক্রম চালায়। প্রথমে তারা গ্রামের সরল-সোজা, কিছুটা লোভী অথবা অতিমাত্রায় ধর্মভীরু মানুষদের টার্গেট করে। এরপর নানা ধরনের সাজানো অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে তাদের মনে গভীর বিশ্বাস স্থাপন করে। যখনই সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির ইশারা রয়েছে, তখনই শুরু হয় তাদের আসল খেলা। তারা গুপ্তধন উদ্ধারের নামে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ দাবি করতে থাকে। কখনো বলা হয় বিশেষ যজ্ঞ করতে হবে, আবার কখনো দামী পশুর কোরবানি দেওয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের আহাজারিতে এখন ফকিরটারী গ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, গুপ্তধনের আশায় তিনি তার জীবনের সব সঞ্চয় হারিয়েছেন। কবিরাজ তাকে সাড়ে চার লক্ষ টাকার স্বপ্ন দেখিয়েছিলো। সেই টাকা জোগাড় করতে তিনি এক লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকার জমি বন্ধক রেখেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সমিতি থেকে এক লক্ষ ত্রিশ হাজার এবং সত্তর হাজার টাকার কিস্তি তুলে চক্রটির হাতে তুলে দিয়েছেন। এখন সেই ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে তিনি সর্বস্বান্ত।
একই গ্রামের এক নারীর গল্প আরও করুণ। তার অসুস্থতাকে পুঁজি করে চক্রটি তাকে বোঝায়, তার শরীরে কোনো রোগ নেই বরং তার ঘরের নিচেই লুকিয়ে আছে বিশাল ধনভাণ্ডার। সেই ধন উদ্ধারের মিথ্যা আশায় তিনি কয়েক দফায় লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়েছেন। এমনকি ছাগল কুরবানি দেওয়ার নামেও তার কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নেওয়া হয়েছে। চক্রটির খপ্পরে পড়ে তিনি তার এগারো শতক জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন এবং আড়াই থেকে সাড়ে তিন লক্ষ টাকা ঋণ করে আজ তিনি পথে বসেছেন।
এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে স্থানীয়রা জিপু ওরফে জিল্লুর রহমান নামে এক কথিত কবিরাজকে দায়ী করছেন। জিপু গত চার-পাঁচ বছর ধরে এলাকায় নেই বলে দাবি করছে তার নিজের পরিবার। এই কাজে ব্যবহৃত সিম কার্ডটি জিপু তার ছোট ভাইয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে তুলেছিল। তার ছোট ভাই এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। তার মতে, তার বড় ভাই অপরাধী হলে আইনের মাধ্যমেই তার বিচার হওয়া উচিত।
ফকিরটারী গ্রামসহ আশেপাশের এলাকার প্রায় ষাটটি পরিবার এই কথিত কবিরাজের খপ্পরে পড়ে আজ নিঃস্ব। শুধু লালমনিরহাট নয়, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য জেলাতেও এই চক্রের জাল বিস্তৃত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সহজ-সরল মানুষের বিশ্বাস আর আবেগকে পুঁজি করে এই চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
এই ঘটনায় লালমনিরহাট সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সত্যতা যাচাই করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে যে সম্পদ আর সুখের আশায় এই পরিবারগুলো সব হারিয়েছে, সেই ক্ষতি পূরণ হওয়া এখন প্রায় অসম্ভব। জিনের বাদশাহ আর গুপ্তধনের মায়াজালে আটকা পড়ে একটি সাজানো-গোছানো গ্রাম আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।






