জামায়াতকে ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাব বিএনপির, স্পিকার পদের দৌড়ে কারা?

কে হচ্ছেন জাতীয় সংসদের নতুন ‘স্পিকার’?- প্রশ্ন একটিই, যার উত্তরের অপেক্ষায় আঠারো কোটি মানুষ। একাদশ ও দ্বাদশ সংসদের টানাপোড়েন পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রালগ্ন ঘিরে এখন দেশজুড়ে বইছে তীব্র কৌতূহলের হাওয়া। নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে সংসদের অভিভাবক কে হতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আজ বুধবার সংসদ ভবনের সরকারি দলীয় সভাকক্ষে সরকারি দলের সংসদীয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বুধবারের এই সভাটি দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের আগামী দিনের পথরেখা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। কারণ, এই বৈঠক থেকেই চূড়ান্ত হবে কে বসবেন স্পিকারের মর্যাদাপূর্ণ আসনে এবং কে-ই বা হবেন ডেপুটি স্পিকার। আগামীকাল বৃহস্পতিবার বসতে যাওয়া জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগেই এই সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত করতে চায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
স্পিকার নির্বাচন নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। বিএনপি চাইছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে সর্বজনগৃহীত কোনো ব্যক্তিত্বকে সংসদের শীর্ষ পদে বসাতে। এক্ষেত্রে কয়েকজনের নাম বেশ জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। দলের প্রবীণ নেতা ডক্টর মঈন খান এবং মেজর হাফিজের নাম রাজনৈতিক মহলে বেশ গুরুত্বের সাথে চর্চিত হচ্ছে। এছাড়াও বিরোধী দলের সাবেক চিফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুকের নামটিও আলোচনার বাইরে নেই। সংসদীয় রীতিনীতি ও পরিচালনা পদ্ধতিতে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় দল।
তবে চমক হিসেবে আলোচনায় এসেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। যদিও তিনি এবারই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তবুও দেশের সংবিধান এবং সংসদীয় আইনকানুন নিয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ও দক্ষতা তাকে স্পিকার পদের দৌড়ে অনেকখানি এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে দলের একাধিক হুইপের মতে, সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হবে বুধবারের বৈঠকেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়া আর কারো পক্ষেই এখন বলা সম্ভব নয় যে, চূড়ান্তভাবে কার ভাগ্যে জুটবে স্পিকারের পদ।
অন্যদিকে, ডেপুটি স্পিকারের পদটি নিয়ে বড় এক রাজনৈতিক ঐক্যের বার্তা দিতে চাইছে বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ডেপুটি স্পিকারের পদটি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। জুলাইয়ের জাতীয় গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যের প্রতি সম্মান জানাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামীকে ইতোমধ্যেই বিষয়টি মৌখিকভাবে ও সরাসরি প্রস্তাব করা হয়েছে। তারা যদি রাজি হয়, তবে স্পিকার নির্বাচনের দিনই তাদের মনোনীত প্রার্থীকে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হবে। তবে জামায়াত যদি এই পদ গ্রহণ না করে, তবে বিএনপি নিজেদের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই একজনকে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে বেছে নেবে।
উল্লেখ্য, আগামীকাল বারোই মার্চ বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সংবিধান অনুযায়ী, বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই হাজার চব্বিশ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু প্রাণনিধনের মামলায় বর্তমানে কারাবন্দী। ফলে প্রথম অধিবেশন শুরুর সভাপতিত্ব কে করবেন, সেটিও এক বড় আইনি ও সংসদীয় চ্যালেঞ্জ।
বুধবারে সংসদীয় দলের সভায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার ছাড়াও সংসদীয় কমিটি গঠন এবং সংসদের অন্যান্য কার্যপ্রণালি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একদিকে নতুন সরকারের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন, অন্যদিকে সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জ- সবমিলিয়ে বুধবারের এই বৈঠকটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করতে যাচ্ছে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, এগারোই মার্চের সেই সভা থেকে আঠারো কোটি মানুষের প্রত্যাশার কোন উত্তর আসে, তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে গোটা বাংলাদেশ।






