কে এই ডিসি কোহিনূর মিয়া! কেন এত আলোচনা!

দীর্ঘ পনেরো বছর পর হারানো চাকরি ফিরে পেয়েছেন আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়া। দেড় দশক আগে যাকে নিয়ে উত্তাল ছিল রাজপথ আর সংবাদপত্র, সেই দাপুটে কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর আবারও ফিরে এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারের এক অভাবনীয় সিদ্ধান্তে তার দীর্ঘ বনবাসের অবসান ঘটলো, যা দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
গত নয় মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পশ্চিম জোনের সাবেক উপকমিশনার মোহাম্মদ কোহিনূর মিয়াকে চাকরিতে পুনর্বহালের আদেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে জারি করা সকল বিভাগীয় বরখাস্তের আদেশ বাতিল করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, পনেরো বছরের এই দীর্ঘ সময়কে বিরতিহীন চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তিনি এই সময়ের যাবতীয় বকেয়া বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সকল সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হবেন। রাষ্ট্রপতির বিশেষ সম্মতিক্রমে তার পুনর্বিবেচনার আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন হলো কে এই কোহিনূর মিয়া? কেন তাকে নিয়ে এত বিতর্ক? বিসিএস দ্বাদশ ব্যাচের এই কর্মকর্তা একসময় ছিলেন পুলিশ বাহিনীর অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। দুই হাজার দুই সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে ছাত্রীদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনায় তার নাম প্রথম প্রকাশ্যে আসে। সেই বছরের তেইশ জুলাই গভীর রাতে হলের ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে ছাত্রীদের ওপর হামলা চালানোর ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে কোহিনূর মিয়ার নাম মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিলো। ঐ ঘটনাটি তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলে।
এরপর ময়মনসিংহ জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় একজোড়া প্রাণহানির মামলায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। ঘটনার সূত্রপাত দুই হাজার চার সালের পাঁচ মে। ময়মনসিংহের নান্দাইলে পৌর নির্বাচনের ভোট চলাকালে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সুজন ও আবু তাহের নামের দুজন প্রাণ হারান। সেই সময় পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে তিনবার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিলেও দুই হাজার সাত সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আওয়ামী লীগ নেতা রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া আদালতে নতুন করে মামলা করলে কোহিনূর মিয়ার নাম অভিযুক্তর তালিকায় উঠে আসে।
দীর্ঘ আইনি লড়াই আর রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের পর এই আলোচিত কর্মকর্তা শেষ পর্যন্ত আইনি বৈতরণী পার হতে সক্ষম হন। দুই হাজার এগারো সালে সিআইডি তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলেও মামলার গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। দীর্ঘ বিশ বছর ছয় মাস ধরে চলা এই আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুই হাজার পঁচিশ সালের চব্বিশ নভেম্বর ময়মনসিংহের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস প্রদান করেন।
তার এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে প্রধান যুক্তি হিসেবে কাজ করেছে আদালতের রায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, যে অভিযোগে তাকে বিভাগীয় মামলায় গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছিলো, সেই একই অভিযোগে দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় আদালত তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে রায় দিয়েছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে আনীত বিভাগীয় অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হওয়ায় রাষ্ট্রপতি তার সাজা মওকুফ করেছেন।
দুই হাজার নয় সালের চার অক্টোবর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে প্রথম সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিলো এবং দুই হাজার এগারো সালের বাইশ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। অবশেষে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আবারও স্বমহিমায় ফিরলেন বিসিএস দ্বাদশ ব্যাচের এই কর্মকর্তা।
পনেরো বছরের এক দীর্ঘ গুমোট নিরবতা ভেঙে কোহিনূর মিয়ার এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন দেশের পুলিশ প্রশাসনের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তার ফিরে আসা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যেমন কৌতূহল আছে, তেমনি পুলিশ বাহিনীর ভেতরেও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। হারানো সম্মান আর পদমর্যাদা ফিরে পেয়ে তিনি কীভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।






